আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা কোন ঘটনা ছিল?
আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা কোন ঘটনা ছিল?
আমি বর্ণান্ধ। আমি পৃথিবীকে সাদা-কালো দেখতে পাই।
মজা করছিলাম। পৃথিবীকে আমি সাদা কালো দেখি না।
তবে, আমি সত্যিই বর্ণান্ধ। আমার লাল-সবুজ বর্ণান্ধতা আছে।
এখন জীবনের বড়ো ধাক্কার ঘটনায় আসি।
আমার যে বর্ণান্ধতা আছে সেটা কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়েই জানতাম।
তখন কলেজের দ্বিতীয় বছরের শেষ সেমিস্টার চলছে। আমি ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং করছি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, দুর্গাপুর থেকে । কয়েকদিনের ছুটিতে বাড়িতে ছিলাম তখন। একদিন সকালে NTPC অর্থাৎ ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশনের একটি বিজ্ঞাপন দেখলাম। চাকরির নোটিফিকেশন।
আর তাতে লেখা আছে, “Candidates with any kind of colorblindness will not be eligible to apply… ” । সেটা দেখে তো আমার মাথা একদম ঘুরে গেলো।
মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়লো যেন। পায়ের নিচে থেকে যেন মাটি সরে গেলে যেমন হয় আর কী! যে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশুনা করছি সেই ইঞ্জিনিয়ারিং করে চাকরি পাবো না? কারণ আমি বর্ণান্ধ?
শুরু করলাম ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি। সত্যিই কি ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরে চাকরি পাবো না? মোটামুটি দেড় বছর চললো এরকম রিসার্চ। ততদিনে বুঝতে পারলাম, বর্ণান্ধতা নিয়ে ইলেকট্রিকাল সেক্টরে আমি সত্যিই চাকরি পাবো না।
অধিকাংশ চাকরি জয়েন করার আগে মেডিকেল টেস্ট হবে আর সেখানে বর্ণান্ধতা থাকলে প্রার্থীপদ বাতিল হয়ে যাবে। আর তার কারণ হলো নিরাপত্তার সমস্যা।
যেমন ধরুন, আমি লাল-সবুজ বর্ণান্ধ। অর্থাৎ আমি কোথাও কোথাও লাল আর সবুজের মধ্যে পার্থক্য করতে পারি না। আর ইন্ডাস্ট্রিতে লাল আর সবুজকে এমার্জেন্সি অ্যালার্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই সাধারণভাবে বর্ণান্ধ প্রার্থীকে মেডিকেল টেস্টে বাতিল করে দেওয়া হয়।
ভাবতে পারেন? একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে যে ইঞ্জিনিয়ারিং করতে এসেছিল, তাড়াতাড়ি একটা চাকরি পাওয়ার জন্যে, পরিবারকে আর্থিক দিক থেকে সাপোর্ট করার জন্যে, তার স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা মুহূর্তের মধ্যে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো।
বিভিন্ন কোম্পানির HR কে মেইল করতে লাগলাম। কোনো উত্তর আসতো না। ইন্টারনেটে সার্চ করেও খুব বেশি একটা তথ্য পাওয়া যেতো না। খুব কম মানুষই এই বর্ণান্ধতা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।
রাত্রি বেলা সবার আড়ালে কান্না করতাম। এক দুজন বন্ধু ছাড়া কাউকে বলতে পারি নি এটা। মা বাবা কে তো কোনোদিন বলতে পারিনি। কিই বা বলতাম। বর্ণান্ধতা- তারা কি বুঝতে পারবে? কি করে বুঝবে? যে বর্ণান্ধতা মাত্র ৮ শতাংশ লোকের হয়, তার সাথে কতজনের পরিচিতি হবে?
যাই হোক, কী আর করা। পথভ্রষ্ট হয়ে গেলাম। সামনে একেবারে অন্ধকার। একেকদিন উপরওয়ালাকে দোষ দিতাম। ভাবতাম পৃথিবীর আট শতাংশ লোকের মধ্যে আমাকেও কেন যুক্ত করা হলো। এত ‘স্পেশাল’ করা হল কেন? একেক দিন ভাবতাম SSC CGL পরীক্ষার জন্যে পড়াশুনা শুরু করে দেবো। একেক দিন ভাবতাম WBCS এর প্রস্তুতি নেবো। আবার এও মাথায় ঘুরতো এত কষ্ট করে ইঞ্জিনিয়ারিং করতে এসে নন-টেকনিক্যাল সেক্টরে চাকরি করব?
কিছুতেই কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। কী করব বুঝতে পারছিলাম না।
তবে হ্যাঁ, একটা মৃদু আলো ছিলো। মোটামুটি দেড় বছর ইন্টারনেটে রিসার্চ করে এটা জানতে পেরেছিলাম IT সেক্টরে বর্ণান্ধতা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। ওরা প্রার্থীদের মেডিকেল টেস্ট করে না।
আর সেই ক্ষীণ আশার আলো নিয়ে Coding শিখতে শুরু করলাম। যদি কোনো একটা জায়গায় চাকরি হয়ে যায়। ছোটোখাটো IT কোম্পানিতে হলেও হবে। কমপক্ষে মা বাবা কে তো বলা যাবে চাকরি পেয়েছি। কিছু টাকা তো বাড়িতে দিতে পারবো। কারণ, আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো সবাই। অর্থনৈতিক দিক থেকে আমার বাড়ি তখন খুবই দুর্বল।
যাই হোক, ইন্টারভিউ দিতে দিতে আর বাতিল হওয়ার ধাক্কা খেতে খেতে প্রথমে IBM কোম্পানিতে চাকরি হলো। প্যাকেজ খুব ভালো না। তবুও কিছু তো একটা হলো, এই ভেবে সান্ত্বনা দিলাম নিজেকে। আর এরকম ভাবে আরও কয়েকটা ইন্টারভিউ দিয়ে অষ্টম সেমিস্টারের শুরুতে চাকরি হলো একটা MNC তে। Qualcomm – Wikipedia (Qualcomm – Wikipedia) । হয়তো অনেকেই নাম শুনেছেন। অধিকাংশ মোবাইলের প্রসেসর তৈরী করে এই কোম্পানিটি। প্রসেসরের বাণিজ্যিক নাম Snapdragon চিপসেট।
এই ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। আর তার থেকে বেরিয়ে আসার গল্প।
তবে হ্যাঁ, জীবনের এই ধাক্কা অনেক কিছু দিয়েছে আমাকে। অনেক কিছু বুঝতে শিখিয়েছে আমাকে। বর্ণান্ধতা নিয়ে ইন্টারনেটে রিসার্চ করার সময়ে ইংলিশ Quora তে খুবই অ্যাক্টিভ ছিলাম। তখন অনেক উত্তর লিখতাম বর্ণান্ধতা বা Color Blindness নিয়ে। এতটাই রিসার্চ করেছিলাম আর ইংলিশ Quora তে উত্তর লিখছিলাম যে Color Vision Deficiency নামের যে টপিক আছে, সেই টপিকের Most Viewed Writer হিসেবে এখনো আমার নাম দেখানো হয়।
English Quora তে এখনো পর্যন্ত 100 জনেরও বেশি ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র আমাকে মেসেজ করে তাদের বর্ণান্ধতার কথা জানিয়েছে। গাইড নেওয়ার জন্যে যোগাযোগ করেছে। 100 জন সংখ্যাটা কম মনে হতে পারে, তবে এটাও মাথায় রাখা প্রয়োজন মাত্র আট শতাংশ মানুষের এই বর্ণান্ধতা হয়। তাদের মধ্যে কতজনই বা ইঞ্জিনিয়ারিং করে?
শেষে একটা ইংলিশ Quote দিয়ে লেখাটা শেষ করি। বিখ্যাত আমেরিকান ঔপন্যাসিক Cormac McCarthy লিখেছেন, “Anyway, you never know what worse luck your bad luck has saved you from…” যার তর্জমা করলে এরকম দাঁড়ায়, আমরা যেটাকে খারাপ সময় বা দূর্ভাগ্য বলি সেটাই হয়তো আমাদের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ জিনিস এনে দেবে। সেই তথাকথিত সাময়িক দূর্ভাগ্য হয়তো আমাদের জীবন আরো নিকৃষ্ট হওয়ার পথ থেকে আগলে রাখে।
ধন্যবাদ।
সাবধানে থাকুন। সুস্থ থাকুন।
✍️ রশিদ (Rashid) (রশিদ (Rashid))